কুন্তল চক্রবর্তী, বনগাঁ। ১৭ই মার্চ ২০২৬-এ উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগর-এ আবারও বসতে চলেছে ঐতিহাসিক মতুয়া মেলা। বহু দশকের ঐতিহ্য বহন করা এই মেলা শুধু একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়; এটি বাংলার সামাজিক জাগরণ, মানবধর্ম এবং আত্মমর্যাদার এক বিশাল প্রতীক। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্তের উপস্থিতিতে ঠাকুরনগর পরিণত হয় এক অনন্য মিলনক্ষেত্রে, যেখানে ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক বন্ধনের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
মতুয়া দর্শনের প্রবর্তক শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর এবং সমাজসংস্কারক শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই মেলা আজ কোটি মানুষের বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। তাঁদের মানবধর্ম, সাম্য ও শিক্ষার বাণী সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস ও জাগরণের সঞ্চার করেছিল। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ঠাকুরনগরের মতুয়া মেলা আজ এক বৃহৎ সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে হাজার হাজার ভক্ত এই মেলায় অংশ নিতে আসেন। পাশাপাশি বিদেশের বিভিন্ন দেশ থেকেও মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের আগমন ঘটে। ফলে এই মেলা এখন এক আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এত বিশাল ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত ঠাকুরনগরের মতুয়া মেলা জাতীয় মেলার স্বীকৃতি পায়নি—যা নিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রশ্ন উঠছে।
এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবাদী নেতৃত্ব সন্তু শিকদার বলেন, “ঠাকুরনগরের মতুয়া মেলা শুধু একটি সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান নয়, এটি ভারতের সামাজিক সমতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। এমন একটি ঐতিহাসিক মেলা জাতীয় স্বীকৃতি না পাওয়া সত্যিই বিস্ময়কর।”
রাষ্ট্রবাদী চিন্তাবিদ জগন্নাথ মন্ডল-এর মতে, “হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের আদর্শ ভারতীয় সমাজে সাম্য ও ন্যায়বোধের এক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছিল। সেই ঐতিহ্যের ধারক এই মতুয়া মেলা। তাই এটিকে জাতীয় মেলার মর্যাদা দেওয়া মানে ভারতীয় সমাজ সংস্কারের ইতিহাসকে সম্মান জানানো।”
ভারতীয় মজদুর সংঘের অন্যতম নেতৃত্ব অরুনাভ পোদ্দার মনে করেন, “এই মেলায় লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে এটি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানুষের সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। জাতীয় স্বীকৃতি পেলে এই ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছাতে পারবে।”
এছাড়াও সমাজের একাংশের নেতৃত্ব সমীর মন্ডল বলেন, “ঠাকুরনগরের মতুয়া মেলা কোটি মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। এত বড় একটি ঐতিহাসিক মিলনমেলা এখনও জাতীয় স্বীকৃতি না পাওয়া দুঃখজনক। এখন সময় এসেছে এই দাবি বাস্তবায়নের।”
বাস্তবিক অর্থেই ঠাকুরনগরের মতুয়া মেলা আজ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতীয় মেলার স্বীকৃতি পেলে এই ঐতিহ্যের মর্যাদা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক পরিচিতিও নতুন মাত্রা পাবে।
তাই এখন একটাই প্রশ্ন সামনে আসে—যে মেলা কোটি মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক, সেই মেলাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? ঠাকুরনগরের মতুয়া মেলা যে জাতীয় স্বীকৃতির যোগ্য, তা আজ ক্রমশ আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।

































































































































































































